বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০১:২৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

প্রয়াণ দিনে অতল শ্রদ্ধা

লেখকঃ লুতফুল কবীর রনি
  • Update Time : শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১
  • ৪৩ Time View
“বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না।” যদি বিপ্লব জন্মায় রাজবলে ভেঙে দাও সে বিপ্লবের কোমর। পাঠিয়ে দাও “যন্তর মন্তর” ঘরে, চলুক “মগজ ধোলাই।” যুগ যুগ ধরে একই পন্থা। তবে পর্দার হীরক রাজের এই “রাজ আদেশ” বারবার ভেঙে দিয়েছেন রিয়েল লাইফের উৎপল দত্ত। তাঁর এক একটা সৃষ্টি যে রব তোলে প্রোসেনিয়ামের বেড়াজাল পেরিয়ে তা আছড়ে পড়ে প্রদীপ জ্বলা কোনও নির্জন গ্রামের কুঁড়েঘরে। তিনি নাটকের জোরে কখনও শান দেন “টিনের তলোয়ারে” কিংবা চিনাকুড়ির কয়লাখনির আগুন “অঙ্গারের” মাধ্যমে মিনার্ভা থেকে ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের রাজপথে।
নাট্যপরিচালক উৎপল দত্ত কেমন করে নাট্যপরিচালনা করতেন? ‘জাতীয় সাহিত্য পরিষদ’-প্রকাশনীর কর্ণধার ও নাট্যরসিক সুনীল দাসের একটি লেখায় তার পরিচয় পাই।
ভারতীয় গণনাট্য সংঘ সে-বার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ নাটকটি মঞ্চস্থ করবে। ‘সে-বার’ মানে, পাঁচের দশকের কথা বলছি। সে-সময় কলকাতার সংগঠনের দায়িত্বে উৎপল দত্ত। বহুচর্চিত এই নাটকটা সবারই পড়া।  তবু, উৎপল দত্ত চরিত্র ভাগাভাগি করে সবার হাতে একটা করে নাটকের কপি ধরিয়ে দিলেন। বললেন, রিহার্সালের দিন নিজের নিজের পাঠ ঝাড়া মুখস্থ করে আসতে। রিহার্সাল হবে ছেচল্লিশ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিটে। সেটাই তখন একাধারে সিপিএমের পার্টি অফিস, গণনাট্যের মহলাকক্ষ, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের আখড়া।  তা, সেখানকার ছোট্ট পরিসরে রিহার্সাল হবে কি করে, এত এত আর্টিস্ট? উৎপল স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জানালেন, সে ভাবনা তাঁর।
‘বিসর্জন’-এর অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কালী ব্যানার্জি, ঋত্বিক ঘটক, উমানাথ ভট্টাচার্য, শোভা সেনের মতো শিল্পীরাও; যাঁরা পরবর্তীকালে নিজের নিজের ক্ষেত্রে স্বনামধন্য হয়েছেন।  তবে তাঁরাও সেদিন ওই ‘এককথার লোক’, ‘সময়নিষ্ঠ’ লোকটার কাছে একেবারে তটস্থ। হ্যাঁ, ‘সময়নিষ্ঠ’। তিনি সত্যজিতের ফেলুদার মতোই পাঁচটা বলতে, পাঁচটাই বোঝেন। বাঁধা সময়ের একচুল এদিক ওদিক হলেই তিনি হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ দুর্বাসা মুনি। তাই রিহার্সালের দিন আপামর সবাই সময়ে এলেন, মুখস্থ করে এলেন।
 সবাই যখন হাজির, তখন উৎপল একটিও কথা না-বলে তাঁদের সামনে দাবার ছক পেতে ঘুঁটি সাজিয়ে বসলেন। সবাই অবাক, এ দিয়ে হবেটা কি! এখন রিহার্সালের সময় খেলা হবে নাকি? নাহ। একটু পরই সবার ভুল ভাঙল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, দাবার ছকটা আসলে উৎপলের মঞ্চ আর ঘুঁটিগুলো এক একটি চরিত্র। সে এক দেখার মতো জিনিস, অভিনব এক পদ্ধতি! উৎপলের নির্দেশে অভিনেতারা নিজের নিজের সংলাপ মুখস্থ বলে যেতে লাগলেন আর উৎপল এক একটি ঘুঁটি চেলে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন কোন চরিত্র কোন দিক দিয়ে ঢুকবেন, কোথায় এসে দাঁড়াবেন, কতটা এগোবেন, কি করবেন–এভাবে পুরো কম্পোজিশন তৈরি হয়ে গেল। ছোট্ট অপরিসর জায়গায় উদ্ভাবনী ক্ষমতায় এভাবেই নাটকের রিহার্সাল করিয়ে নিলেন উৎপল। আর এই দাবার ছকে ঘুঁটির চাল মাথায় রেখেই প্রতিটি অভিনেতাকে মঞ্চে নামতে হল। মাথায় না রেখে কারও উপায় নেই, একটু এদিক ওদিক হবার জো নেই; মেজাজী মানুষ উৎপল বকুনির চোটে একেবারে ভুত ভাগিয়ে ছাড়বেন যে! তবে এর মধ্য দিয়ে যখন তা মঞ্চস্থ হল, তখন ‘বিসর্জন’ হয়ে উঠল যেন ‘সুপরিকল্পিত সুসংহত এক চলচ্চিত্র’! সে এক অপূর্ব প্রযোজনা! যাকে বলে, কালজয়ী। আর এই সুপরিকল্পিত প্রযোজনা সম্ভব হয়েছিল উৎপল দত্তের অভিনব উদ্ভাবনী ক্ষমতা, কড়া এবং খুঁতখুঁতে সাহেবি মেজাজের জন্যই।
ডিসিপ্লিনের ভিত্তি হচ্ছে স্যাকরিফাইজ,নিজে ত্যাগ না করলে অন্যকে ডিসিপ্লিন্ড করা যায় না” – উৎপল দত্ত
হীরক দেশের রাজা। স্বৈরশাসক, কৌতুকপ্রবণ, উৎপীড়ক। এমন একটি জটিল চরিত্রে সত্যজিৎ রায় উৎপল দত্ত ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারেননি। কারণ উৎপল দত্তের মতো জবরদস্ত অভিনেতা বাংলা চলচ্চিত্রের ভুবনে সে সময় আর তেমন কেউ ছিলেন না। ‘হীরক রাজার দেশে’র রাজা, ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ এর মগনলাল মেঘরাজ, ‘আগন্তুক’ এর মনোমোহন মিত্র, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র হোসেন মিয়া, ‘অমানুষ’ এর মহিম ঘোষাল, ‘দো আনজানে’র চিত্র পরিচালক, ‘জনঅরণ্যে’র বিশুদা এমনি কত চরিত্রেই না অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।
বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে যেমন ছিলেন অপরিহার্য তেমনি তিনি ছিলেন মঞ্চের শক্তিমান অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার।
নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়।’- সেই বিচিত্র নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত। পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ অবিভক্ত বাংলার বরিশালের কীর্তনখোলায়। বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা দত্ত।
বাংলা তথা ভারতের নাট্য সমাজের এক আশ্চর্য, তুলনাহীন, ব্যাক্তিত্বের নাম উৎপল দত্ত । তিনি যে কেবল নট, নাট্যকার, নির্দেশক, গবেষক, চিন্তাবিদ বা কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রচারক ছিলেন, তা নয়। তার সব কিছু নিয়ে ভারতীয় নাট্য জগতে যে বিপুল আলোড়ন উঠেছিল, তার সময়কালে আর কোনো নাট্য ব্যাক্তিত্বকে ঘিরে তেমনটা হয়নি। তার মতো আগে কেউ ছিলোনা, পড়েও কেউ আসেননি। পুলিশি নির্যাতন, কারাবাস, দুস্কৃতি দের দিয়া তাঁর নাটকের উপর আক্রমণ…কোনও কিছুই থামাতে পারেনি সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত এই নাট্য ব্যক্তিত্বকে।
দেশভাগ এবং কংগ্রেস দলের ক্ষমতা প্রাপ্তিকে তিনি স্বাধীনতা বলতে ছিলেন নারাজ।  বলেছেন, ‘কেবলই ক্ষমতার পালাবদল, কাঠামো বদল নয়।  ভারত স্বাধীন হয়েছে বিনা রক্তপাতে, অহিংস সংগ্রামে, খদ্দর পরিধানে, চরকা কাটায়।  তবে তো ক্ষুদিরামসহ অজস্র আত্মদানকারী বীর শহীদের নাম মুছে যাবে ইতিহাস থেকে? সূর্যসেন, ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাঈ, তিতুমীর এবং নৌ-বিদ্রোহ, নেতাজী সুভাষের সশস্ত্র আই.এন.এ বাহিনী ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের কেউ নয়’।  ভারতের তথাকথিত স্বাধীনতায় জনগণের মুক্তি অর্জিত হয় নি।  এই কথা তাঁর নাটকে বার বার এসেছে। তিনি তাঁর নাটকে বলেছেন, অস্ত্র ছাড়া বিরোধী শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব নয়।  তাই তাঁর রাইফেল নাটকের রাইফেল হয়ে ওঠে গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার।
‘শুন গো ভারত ভূমি কত নিদ্রা যাবে তুমি উঠ ত্যজ ঘুমঘোর হইল হইল ভোর দিনকর প্রাচীতে উদয় ।’ উৎপল দত্ত (টিনের তলোয়ার) বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র এবং নাটকে সব্যসাচীর পরিচয় দেয়া উজ্জ্বল নক্ষত্র উৎপল দত্ত জাগিয়ে গেছেন ভারতকে। তাঁর নাটকের সংলাপে ঘুমন্ত চেতনা জেগে ওঠে। মনের সঙ্গে মনের হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। মনে হয়, কেবল মনে হয় আমরা যে পচা সমাজে বাস করছি, সেটা আমাদের নয়। আমাদের আরো উন্নত হতে হবে। দাঁড়াতে হবে সেই উর্দ্ধগগনে মুখ তুলে।  উৎপল দত্ত কমেডিয়ান। কিন্তু মূলত উইট প্রকৃতির কৌতুকাভিনেতা। তাঁর একেকটি সংলাপ হাস্যরসের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেয় জীবনের আসল সত্য!
  উৎপল দত্ত বাংলা পথনাটকের পথিকৃৎ। ১৯৫১ সালে উমানাথ ভট্টাচার্যের এক রাতের মধ্যে লেখা ‘চার্জশীট’ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম পথনাটক। অভিনীত হয়েছিল হাজরা পার্কে। নাটকে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটক, মমতাজ আহমেদ ও পানু পাল।   উৎপল দত্তকে নকশাল আন্দোলন আগ্রহী করে তুলেছিল। অন্যায় দেখলে তাঁর রক্ত টগবগ করে ফুটত। তিনি আজীবন মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও দায়বদ্ধ শিল্পী নকশাল রাজনীতির জোয়ারে ভেসে গিয়েছিলেন।
অভিনেতা উৎপল দত্তর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা হয় মধু বসুর ‘মাইকেল’ ছবিতে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। অসংখ্য বাংলা ও হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। তবুও তাঁর নিজের ভাললাগার ছবিগুলি তৈরি হয়েছিল অজয় কর, তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, শক্তি সামন্তর মতো পরিচালকের ছবি দিয়ে। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ তাঁকে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। এত কিছুর পরও যাঁর ছবিকে তিনি বারংবার কুর্ণিশ করতেন তিনি বাংলা সিনেমা জগতের দিকপাল সত্যজিৎ রায়। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎবাবুকে তিনি আবেগিক এক চিঠি লিখেছিলেন।
বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় উৎপল দত্তের অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “উৎপল যদি রাজি না হত, তবে হয়তো আমি ‘আগন্তুক’ বানাতামই না।”   সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে, জয়বাবা ফেলুনাথ, আগন্তুক, গৌতম ঘোষের পদ্মা নদীর মাঝি’তে অভিনয় করে উৎপল দত্ত সারা ফেলেছেন।
 ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকে ময়নার সেই উদাত্ত কণ্ঠের উক্তি কানে বাজে, যা কিনা একজন হতাশাগ্রস্ত মানুষকে সহজেই মাটি থেকে টেনে তুলতে পারে। ময়না বলেছিল ‘…দারিদ্রকে আমি ঘৃণা করি । সোপান বেয়ে ধীরে উঠেছি এখানে, গায়ে উঠেছে গয়নাত, পায়ের কাছে হাতজোড় করে ধন্না দিয়ে পড়ে আছে কলকাতার বড়লোকের দল। আবার ধাপে ধাপে নেমে গিয়ে গেরস্ত ঘরে ঝি-গিরি আমি করতে পারবো না ।’ উৎপল দত্তের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিশ্বাসী সংলাপ জনগণের হৃদয়ে আজীবন ঢেউ তুলবে।
জনগণের মুক্তি সংগ্রামে অবিচল উৎপল দত্ত অজস্র নাটক রচনা করেছেন।  নিদের্শনা দিয়েছেন এবং অভিনয়ও করেছেন।  পিপলস্‌ থিয়েটার এবং ভারতীয় গণনাট্যের নানা কর্মকাণ্ডে জনগণকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামিল করতে জীবনের সুদীর্ঘ সময় পার করেছেন।
১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট, আজকের এই দিনে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেছিলেন পরপারে।
আজ তার মৃত্যুবার্ষিকী। বাঙালি অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক উৎপল দত্তের মৃত্যু দিনে  শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখকঃ লুতফুল কবীর রনি

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 abcbdtv
Design & Develop BY ABC BD TV
themesba-lates1749691102