বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৬:০০ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ

কবি লোরকার প্রয়াণ দিবসে অতল শ্রদ্ধা।

লেখকঃ লুতফর কবির রনি।
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৯ আগস্ট, ২০২১
  • ৬৮ Time View
” তাঁর কী অপরাধ ছিল ? তাঁর বন্ধুরা গণতন্ত্রী  — কমিউনিস্ট তাই ?  তিনি গ্রাম গ্রামান্তরে নাটক দেখিয়ে বেড়ান ? তিনি গান লেখেন , গানে সুর দেন বলে ?  তিনি তাঁর কবিতায় একটা দেশের সমস্ত অশ্রু ঝরান বলে ? তিনি মানুষের অন্তরের এক একটি গোলাপের পাপড়ির ওপর মুক্তোর মত অশ্রুবিন্দু রাখেন বলে ?….. তিনি জলপাই গাছের নীচে চাঁদকে নামতে দেখেন বলে ? তিনি আহত পায়রার ডানার ছায়া দেখেন  সেজন্য ?…..  “
           —– ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলেন প্ৰিয় বন্ধু পাবলো নেরুদা।
       স্পেনের বিখ্যাত কবি – নাট্যকার – সংগীতকার – চিত্রশিল্পী  ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জন্ম হয় ১৮৯৮ সালের ৫জুন। প্রেম , প্রকৃতি , আদিম জীবনের সরলতা , প্রাণোচ্ছল সংগীতের সুরমূর্ছনা তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য । কাব্য ও নাটকে রচনা করেছিলেন নতুন নিজস্ব শৈলী । পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুর পীড়ণে বিপর্যস্ত মানুষের সংগ্রামও প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। তাঁর কবিতার মধ্যে ফ্যাসিস্টরা তাদের মৃত্যু আতঙ্ক দেখেছিল ।
“দৈত্যদের কোনো ছায়া থাকে না।
“আহ কাঠুরিয়া, আমার ছায়াটা কেটে ফেল তুমি।”
 -লোরকা
কী অসাধারণ কবি! আমি আর কারো মধ্যে তাঁর মতো প্রতিভা ও প্রসন্নতার, গগণবিহারী হৃদয়ের উন্মুক্ততা ও স্ফটিক প্রপাতের উজ্জ্বলতার এমন অনুপম সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত দেখিনি। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার প্রফুল্লতা ছিল চুম্বকের মতো, যা বিকীরিত হতো তাঁর চারপাশে, যা জীবনের প্রতি জাগিয়ে তুলতো আনন্দ-আবেশ। আবহমান স্পেনের লৌকিক ঐতিহ্যের তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তাঁর শেকড় ছিল আরবীয় আন্দালুসীয় সুষমামণ্ডিত জমিনে, যা দীপান্বিত ও সুরভিত করেছিল হিস্পানি জীবনের এমন একটা পর্যায়, হায়, যার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।”
লোরকা সম্পর্কে এই কথাগুলো তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন চিলির পাবলো নেরুদা, হিস্পানি ভাষার আরেক মহান কবি। নেরুদার কথা থেকেই বোঝা যায়, কবিতার বিশ্বপটে অসাধারণ এক কবি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল লোরকার।
লোরকা ছিলেন উনিশ শতকের বিখ্যাত ‘জেনারেশন অব সেভেন্টিন’ এর একজন। তার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, কবি রাফায়েল আলবারটি, কবি পাবলো নেরুদা, বুলফাইটার-কবি-নাট্যকার ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস, চিত্র পরিচালক লুই বুনুয়েলসহ অনেকেই। লোরকা প্রথম জীবনে জিপসি ও ফ্লেমিংগো সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হন। তার উল্লেখযোগ্য বই হলো ব্লাড ওয়েডিং, ইয়ারমা অ্যান্ড দি হাউস অব বার্নাডা এবং এলবা ইত্যাদি।
দূর উঁচু নীলাভ পর্বতমালা।
পর্বতমালার উপরে সারি সারি পাইন গাছে ছাওয়া ঘন নিবিড় অরণ্য। সেই অরণ্যের মাঝখানে ছায়াঢাকা মায়াময় এক গভীর উপত্যকা। আর, এর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতেই বর্ণময় ফুলে ফুলে ছাওয়া খুব আটপৌরে একটি সমাধি। পাইনের মাতাল করা গন্ধ গায়ে মেখে আন্দালুসীয় মৃদুমন্দ এলোমেলো হাওয়া উড়ে আসছে সেখানে। মমতা মাখানো আলতো কোমল পরশ বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সেই সমাধিক্ষেত্রে। গভীর ভালবাসায় রিনরিন শব্দে ঝরা পাতারা আবেশী প্রেমিকার মত লুটিয়ে পড়ছে সমাধিক্ষেত্রের বুকে।
এখানেই যে শুয়ে আছেন আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠতম কবি এবং নাট্যকার, কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। অপূর্ব রূপবান এক মহতি কবি। ফ্যাসিস্ট ফ্রাংকোর ফ্যালাঞ্জিস্ট বাহিনী এখন থেকে চুয়াত্তর বছর আগে এই মানবতাবাদী কবিকে হত্যা করেছিল ভয়াবহ নৃশংসতায়। তারপর তার লাশ গায়েব করে দিয়েছিল কাপুরুষের মত।
ঘুম দেব আমি এক মুহূর্ত ,
এক মুহূর্ত , এক মিনিট , এক শতাব্দী ;
কিন্তু সবাই জেনে রেখো আমি এখনো মরি নি ….
ফেদেরিকা গার্সিয়া লোরকা ১৯৩৬ সালের এই দিনে স্বৈরাচারী শাসক ফ্রাঙ্কোর জাতীয়তাবাদী মিলিশিয়াদের হাতে গুলিতে নিহত হন , লোরকা তার মৃত্যুর রক্তাক্ত পটভূমিতে নতুন এক জীবনে প্রতিষ্ঠা পান ।দুনিয়াজুড়ে মমতাভরা গভীর ভালোবাসায় ফিরে আসেন কবিতার এই শহীদ ।
গণবিরোধী ফ্রাঙ্কো ও চেয়েছিল আর সব স্বৈরাচারের মত সৃষ্টিশিলতাকে হত্যা করতে , কিন্তু কোনদিন কেউ তা পারে নি ।
লোরকা কি জানতেন যে তাকে এভাবে খুন করা হবে? কবিরা কি ভবিষ্যতদ্রষ্টা হন? কোন এক বিচিত্র উপায়ে দেখতে কি পান না ঘটা ঘটনাপঞ্জিকে? অনুভব কি করতে পারেন অনাগত সময়কে? নাহলে কী করে তিনি মৃত্যুর কয়েক বছর আগেই লিখে যান এমন কবিতা, যে কবিতার সাথে হুবহু মিলে যায় তার মৃত্যুকালীন ঘটনাসমূহ। লোরকার সেই কবিতার কয়েকটি পংক্তি এরকম-
আমি বুঝতে পারছি, খুন করা হয়েছে আমাকে।
তারা ক্যাফে, কবরখানা আর গীর্জাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।
তারা সমস্ত পিপে আর ক্যাবার্ডগুলো তছনছ করেছে।
তিনটে কংকালকে লুট করে খুলে নিয়ে গেছে সোনার দাঁত।
আমাকে তারা খুঁজে পায়নি।
কখনো-ই কি পায় নি তারা?
না, কখনোই নয়।
ডন কুইজোট এবং জিপসিদের বর্ণিল ফ্লামেনকো সঙ্গীত এবং নাচের প্রেমময় রোমাঞ্চকর স্পেন। তিরিশের দশকে সেই রোমাঞ্চকর প্রেমভূমি কেঁপে উঠেছিল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দামামায়। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই গৃহযুদ্ধে অর্ধ মিলিওনেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছিল।
যুদ্ধের দিনগুলোতে মানুষ হারিয়ে যেতে থাকে। কারও দরজায় টোকা পড়ে। কেউ গুম হয়ে যায়। কাউকে চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে। দেশে দেশে, যুগে যুগে যেন একই দৃশ্য রচনা হয় বারবার। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ও তা-ই হয়েছিল। স্পেনে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যেই অন্ততপক্ষে এক লাখ ১৪ হাজার মানুষ ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান! সে সময় জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর শিকারদের একজন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা।
পাঁচজন মানুষ একসঙ্গে নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নেন এবং কয়েদিদের ওপর গুলি চালান।
সেই রাতের সেই গগনবিদারী গুলির প্রতিধ্বনি যারাই শুনে থাকুক না কেন, তারা কেউই জানত না যে আসলে কী ঘটছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাতে থাকেন রক্তাক্ত লোরকা। অবশেষে সৈন্যদের একজন এসে চিরতরে নিভিয়ে দেন তাঁর জীবনশিখা। নিথর হয়ে যায় লোরকার দেহ। আর হঠাৎই যেন বন্ধু ইগনাসিও সানচেজ মেহিয়াসের (বিখ্যাত স্প্যানিশ বুল ফাইটার) নির্মম মৃত্যু নিয়ে লেখা তাঁর নিজের পঙ্‌ক্তিগুলো তাঁর নিজের পরিণতির সঙ্গেই সম্পূর্ণ মিলে যেতে থাকে, লোরকা লিখেছিলেন:
কিন্তু এখন সে চিরনিদ্রিত
এখন তার কঙ্কাল ফুঁড়ে জন্ম
নেবে গুল্ম ও ঘাসফুল নিশ্চিত
এখন তার রক্তধারায় শোনা যাবে
আরাধ্য সংগীত
এভাবেই মৃত্যু হয়েছিল ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার, স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শেষ হতে তখনো অনেক দিন বাকি।
এরকমই এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন লোরকা। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়স তার তখন। ১৯৩৬ সালের অগাস্ট মাসের ১৮ তারিখে লোরকাকে গ্রানাডার জেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের পাদদেশে। একজন শিক্ষক এবং দু’জন ন্যাশনালিস্ট বিরোধী বামপন্থী বুলফাইটারের সাথে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। হত্যার পরে অবহেলায় অন্যদের সাথে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ফ্যালাঞ্জিস্টরা বহুদিন ধরেই লোরকাকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এর পিছনে কারণও ছিল। লোরকা প্রকাশ্যেই তার সমর্থন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। তিনি কোন পক্ষের লোক সেটা বুঝতে কারোরই সময় লাগেনি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সবসময়ই তাদের সাথে থাকবো যাদের সহায়সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই, এমনকি সেই কিছু না থাকাটাকেও যাদেরকে শান্তিতে উপভোগ করতে দেওয়া হয় না।‘
ফ্রাংকোর স্বৈরাচারী সরকারতো লোরকাকে হত্যা করার কথা স্বীকারই করেনি। যুদ্ধে আহত হয়ে রাস্তার ধারে মরে পড়েছিল বলে ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিল তারা।
প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরের পাঁচ বছর ধরে বামপন্থী প্রশাসকেরা স্পেনের পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ব্যাপক উচ্চাভিলাষী সব সংস্কার সাধন করেন। এর মধ্যে নারী অধিকার বৃদ্ধি, ভূমিহীন কৃষকদের দুর্দশা লাঘবে নতুন কৃষি আইন প্রণয়ন, শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্যাথলিক চার্চের প্রভাবমুক্ত করতে নানাবিধ পরিবর্তন সাধন থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর প্রভাব হ্রাস করতে তাদের অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন ইত্যাদি ছিল অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী স্প্যানিশ সমাজকাঠামোর ওপর এই সব আঘাতের দরুন সংস্কারপন্থী তথা খোদ প্রজাতন্ত্রেরই অসংখ্য শত্রুপক্ষ তৈরি হয়, যাদের মধ্যে রাজভক্ত রাজতন্ত্রবাদী থেকে শুরু করে রক্ষণশীল ক্যাথলিক, ধনী ভূস্বামী থেকে স্প্যানিশ ফ্যাসিবাদী পার্টি, দ্য ফ্যালাঞ্জ সবাই ছিল। এই সব গোষ্ঠী ফ্রাংকো আর তাঁর জেনারেলদের অধীনে একত্র হয়ে স্পেনের ক্ষমতা দখল করে আগের সেই গৌরবময় রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই স্বপ্নের অংশ হিসেবেই তারা লোরকার মতো প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষদের নিজেদের পথের কাঁটা জ্ঞান করে তাঁদের চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ বিকেলে লোরকা যখন ভগ্নিপতির হত্যার খবর পান, তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রুইজ আলোনসো আর তাঁর ১০০ জন সশস্ত্র সৈন্যের একটা বাহিনী লুই রোজালেসের বাড়িটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে কিংবদন্তিতুল্য দস্যুকে পাকড়াও করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সে সময় বাড়ির সব পুরুষ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকায় মিসেস রোজালেস লোরকাকে হানাদারদের হাতে সোপর্দ করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু রুইজ আলোনসো তাতে না দমে মিসেস রোজালেসকে বলেন, ‘এই লোকটি শুধু কলম দিয়েই আমাদের যে ক্ষতি করেছে, তা অস্ত্র দিয়েও করা সম্ভব নয়।’
জীবিত কবি ভীতিকর, কিন্তু মৃত কবি বড়ই ভয়ংকর।
কবি পাবলো নেরুদা লোরকার মৃত্যু সংবাদ শুনে বিপন্ন উচ্চারণে বলেছিলেন, ‘স্পেনের সেরা ফুল ঝরে গেল।‘ আসলেই তাই। স্পেন তার আর কোন কবি বা শিল্পীকে এত আবেগ আর ভালবাসা দিয়ে বুকে টেনে নেয়নি। রুশ কবি মায়াকোভস্কির মতই হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গলা খুলে কবিতা পড়তে ভালবাসতেন লোরকা। মানুষের প্রতি তার অপরিসীম ভালবাসায় মানুষ ফিরিয়ে দিয়েছিল শতগুনে তাকে।
 নতুন সহস্রাব্দেও মাটি খুঁড়ে খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, যদি পাওয়া যায় কোনো চিহ্ন ৷ কিন্তু নিস্ফল হয়েছে সেই অনুসন্ধান ৷ কিন্তু মৃত্যুর ৮৫ বছর পরেও তিনি বেঁচে আছেন স্পেইনের মানুষের মনে ৷ বেঁচে আছেন বিশ্বের অগণিত কবিতা প্রেমীর হৃদয়ে ৷ একনায়ক ফ্র্যাংকোর খুনে বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে ১৯৩৬ সালের ১৮ ই আগষ্ট নিহত হন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ৷ গণকবরে মাটি চাপা দেওয়া হয় ৷ তারপর একনায়কতন্ত্রের জমানা শেষ হতেই কমিশন বসিয়ে তাঁর দেহাবশেষখোঁজার কাজ শুরু হয় ৷ হত্যার সময় তাঁর বয়স মাত্র ৩৮ বছর ৷ তার মধ্যেই কবিতা, গান আর নাটকে স্বদেশের ছবি এঁকে তিনি হয়ে ওঠেন বহু মানুষের নয়নের মণি ৷ তাঁর কবিতায় প্রকৃতি,লোকগাথা,উৎসব,প্রেম মৃত্যু এবং ষাঁড়ের লড়াই এসেছে ছবির মতো ৷ মরমে গেঁথে যায় ,সে লেখার ভাষা।
 বন্ধু সালভাডোর দালি বা লুই বুনুয়েলের মতো রাজনীতির কথা সোচ্চারে না বললেও, শুধু কবিতায়,গান আর নাটকেই বুঝিয়ে দেন তিনি মানুষের অধিকারের পক্ষে ৷ শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকটি স্পেনীয় অনুবাদে লোরকা এবং বুনুয়েলের অভিনয়ে জনপ্রিয় হয় ৷ কিন্তু সামরিক শাসকরা এসব ভালোচোখে দেখেনি ৷ তাই কবিকেও হত্যা করা হয় ৷
তাঁর হত্যার খবর পেয়ে আরেক বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা মন্তব্য বলেছিলেন- স্পেইনের সেরা ফুল ঝরে গেল ৷ বাংলার কবি সুনীল গাঙ্গুলী লোরকাকে নিয়েই লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা – কবির মৃত্যু ৷ তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য কবিতা,তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ৷ এতো বছর পরেও তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টি  অমলিন হয়ে আছে ৷
স্পেনের জল মাটিতে শিকড় গেড়ে বসে ছিলেন লোরকা। স্বদেশের বিচিত্র রূপ-রস, গন্ধ, বর্ণ তাকে রেখেছিল আচ্ছন্ন করে। দেশের যা কিছু সম্পদ, যা কিছু বর্ণময়, যা কিছু উজ্জ্বল তাকেই ভালবাসার চাদর মুড়িয়ে পরম যত্নে তুলে এনেছিলেন তিনি। তার কবিতা হয়ে উঠেছিল দেশ আর দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসার অফুরন্ত আধার।
আন্দালুসিয়ার জল, মাটি, নিসর্গ, লোকগাথা, উৎসব আয়োজন, কৃষকজীবন, দুরন্ত ষাড়ের লড়াই সবকিছু নতুন আদল পেয়ে উঠে এলো লোরকার কবিতায়। জিপসিদের বর্ণময় বাঁধনহীন মুক্তজীবনও মূর্ত হয়ে উঠলো নতুন স্বাদে, নতুন ঘ্রানে।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রোমান্সেরো গিতানো’ প্রকাশ হবার সাথে সাথেই সারা স্পেনের নয়নের মণিতে পরিণত হন তিনি। এত গভীর ভালবাসা দিয়ে, এত মায়াময় দরদ দিয়ে, এত প্রবল প্রেম দিয়ে, এত তীব্র আবেগ দিয়ে আর কেউ যে স্বদেশের কথা বলেনি আগে। সেই যে স্বদেশ উঠে এলো লোরকার তুলিতে, আর কখনোই তা থামেনি। আজীবন দেশ, মানুষ আর মাটিকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন তিনি, বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। শুধুমাত্র মৃত্যু এসেই বিরাম চিহ্ন টেনেছে সেখানে।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে অসাধারণ কিছু সনেট লিখেছিলেন লোরকা। গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত ডামাডোলে হারিয়ে গিয়েছে সেই সব সনেটগুলো কোথায় কেউ জানে না। অসম্ভব ভালবাসা আর কষ্ট মাখানো সেইসব অমূল্য রত্নভাণ্ডার আর খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও।
লোরকার উপস্থিতি এতই দ্যুতিময় ছিল যে তার পাশে সব কিছুকেই বড় বিবর্ণ বলে মনে হত। তার কবি বন্ধু জর্জ গুইলেন বলেছিলেন যে, ‘লোরকা আশেপাশে থাকলে গরম-ঠান্ডার কোন অনুভূতিই টের পাওয়া যেত না। তার উপস্থিতি এমনই মাদকপূর্ণ ছিল যে সবকিছু ভুলে তা হয়ে উঠতো লোরকাময়।‘
সময়ের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন লোরকা। ফলে বহু লোকের চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। তার মেধা, তার সাফল্য, তার চিন্তাভাবনার প্রাগসরতা, সমকামিতা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইয়ান গিবসন তার ‘পোয়েট’স ডেথ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘লোরকার মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঈর্ষা এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। তার মেধা, সাফল্য, মুক্তচিন্তা, বামপন্থী ধ্যানধারণায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তৈরি হয়েছিল অসংখ্য শত্রু। তারাই তাকে বাঁচতে দেয়নি। সামরিক জান্তা স্পেনের ক্ষমতা দখলের পর তার মৃত্যু হয়ে উঠেছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।‘
লোরকার দৈহিক মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছে তার শত্রুরা ঠিকই। কিন্তু মুছে ফেলতে পারেনি তার অস্তিত্বকে। আজো সারা পৃথিবীর সকল বিপন্ন কবির অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে লোরকার বেঁচে রয়েছেন আমাদের মাঝে।
কবিতার শহীদ ফেদেরিকো গারসিয়ায়া লোরকা  কুয়োর ভেতরে ফেলে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল, তা এখনও  খুঁজে পাওয়া যায় নি।
দু’জন খসখসে সবুজ উর্দিপরা সিপাহী/ কবিকে নিয়ে গেল টানতে টানতে/ কবি প্রশ্ন করলেন : আমার হাতে শিকল বেঁধেছ কেন?/সিপাহী দু’জন উত্তর দিল না;/সিপাহী দু’জনেরই জিভ কাটা।
এই কবির নাম লোরকা, যিনি ঘুমিয়ে আছেন দখিন গ্রেনাডায়। বুকে ধারণ করেছেন সোনালি তৃণভূমির মাধুর্য, স্রোতস্বিনীর কুল কুল ধ্বনি, ঝোড়ো বাতাস কেপে ওঠা প্রজাপতির ওম। আকাশ জানে, বাতাস জানে, ফুল জানে, প্রজাপতি জানে, বীণা জানে- শুধু মানুষ জানে না। লোরকা কোথায় শুয়ে আছেন।
শাসকের লোরকার দরকার নেই, জীবনের আছে।
এখনও তাঁকে খুঁজে ফেরে আন্দালুসিয়ার আকাশ,বাতাস,মাটি , আর মানুষেরা ৷
 মানবাধিকারের কবি শহিদ লোরকার মৃত্যুদিনে তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধা, আর ভালোবাসায় ৷

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 abcbdtv
Design & Develop BY ABC BD TV
themesba-lates1749691102