বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০১:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

শুভ জন্মদিন আইয়ুব বাচ্চু

মোস্তাফিজুর রহমান লাকি। বাগেরহাট
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১
  • ৩৬ Time View
গিটার যে কাঁদে, ভাসায় জোয়ারে, রক্তে ঢেউ লাগে ছলাৎ ছল…ছটা তারে শোনা যায় পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ…তা প্রথম জেনেছিলেন জিমি হেনড্রিক্স, আর অনন্ত অপেক্ষার পর জেনেছিল পদ্মাপারের নক্ষত্ররা। যাদের রাত জাগিয়ে সুর শোনাতেন আইয়ুব বাচ্চু। গিটারের ভালোবাসায়। শিউলি ঝরা হেমন্তের সকালে হঠাৎ করেই চুপিচুপি তিনি চলে গেলেন। রেখে গেলেন আড্ডা, গান, গল্প , গিটার।
‘বাবা কখনোই চাননি আমি এই লাইনে থাকি। বাবা বলতেন তুমি শেষ, তোমার মত বাউলের এই বাড়িতে কোন জায়গা হবে না।’
বেশ কষ্ট ও অভিমান নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আসলেই এই বাউলগিরি করে আমার জীবন শেষ’। কোথায় যেন তার দুঃখ ছিল, ছিল অভিমান। তাই হয়তো গেয়েছিলেন, এই বুকের যন্ত্রনা বেশী সইতে পাড়ি না, এতবেশী কাঁদালে উড়াল দিব আকাশে।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন পুরোপুরি মিউজিক পাগল একটি ছেলে। দিন রাত তার খালি গিটার আর গিটার। স্বাভাবিকভাবেই  আমাদের দেশের প্রচলিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই রকম ছেলেকে বলে উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। তাকে বের করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে।
তখন তার মা তার হাতে তখনকার সময়ে ৩৫০ টাকা দিয়ে বলেছিলেন, বাবা তুই যখন গান বাজনাই পছন্দ করিস, তবে তুই এটাতেই লেগে থাক। মায়ের দেয়া সেই টাকা নিয়ে তিনি ঢাকায় এলেন। শুরু হলো তার মিউজিক নিয়ে জীবন যুদ্ধ।
এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘শিল্পী জীবনের লক্ষ্য কী?’ চির বিনয়ী মানুষটি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভাল মানুষ হতে চাই।’‌ মাটির মানুষ, বিনয়ী মানুষ আইয়ুব বাচ্চু একজন কিংবদন্তি শিল্পীর জন্য, একজন নিখাদ মানুষের জন্য। যাঁর জন্য গলা ছেড়ে গাওয়া যেতেই পারে, ‘তুমি কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়।’‌
কৈশোরে প্রেমকে বিরহে হতে দেখেছি আমরা।তখন আইয়ুব বাচ্চু সেই তুমি নিয়ে এলেন,প্রিয়াকে ফিরে পাবার আহ্বানে আমাদের প্রজন্মের কাছে সেই তুমি হয়ে রইল আবেগের নাম।
‘সেই তুমি’ গানটি মালিবাগের একটি বাড়িতে বসে লিখেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তিনি বলেন ‘দিনক্ষণ ঠিক মনে নেই। তবে ১৯৯৩ সালের কোনো একদিন হবে। আমি তখন পশ্চিম মালিবাগে থাকতাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক বসাতেই গানটির সৃষ্টি। আমারই লেখা। আমারই সুর করা। আমারই গাওয়া। এক লাইন লিখি আর গিটারে সুর করি। এভাবে গানটা তৈরি হয়। অবশ্য গানটি রেকর্ড করতে অনেক সময় লেগেছে। সংগীত আয়োজনে সময় লেগেছে দুই দিন। কণ্ঠ দিতে বেশি সময় লাগেনি।’
‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে
সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম
কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি
কীভাবে এত বদলে গেছি এই আমি
ও বুকেরই সব কষ্ট দুহাতে সরিয়ে…’
আজ থেকে ২৫ বছর আগে প্রথম শোনা আইয়ুব বাচ্চুর এই গান আজও নাড়া দিয়ে যায় সব প্রজন্মের শ্রোতাদের। কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ, কী অদ্ভুত নস্টালজিয়া এই গানে। বাড়ির স্টেরিওতে ৩৫ টাকার ক্যাসেট দিয়ে যে গান শোনার শুরু, সিডি–এমপিথ্রির যুগ পেরিয়ে আজকের ইউটিউবের কালেও গানটি কতই না প্রাসঙ্গিক।
ভায়োলিনের করুণ মূর্ছনায় হৃদয় মোচড় দেয়া সুতীব্র ক্রন্দনের মতো আজও  বাচ্চুর হিরণ্ময় কন্ঠ বলে যাওয়া–”এখন অনেক রাত/ খোলা আকাশের নিচে/জীবনের অনেক আয়োজন আমায় ডেকেছে/তাই আমি বসে আছি দরজার ওপাশে…।”
বাচ্চু আমাদের শোনান তাঁর ‘ঘুমন্ত শহরে’ গানটিতে। সে এক বিষাদগ্রস্ত মানুষের গল্প: এই রাতে যেসব প্রেম হারিয়েছে অকারণে, দরজার চৌকাঠের ওপরে যে নিশি ব্যস্ত মানুষ হয়ে বসে আছে সমুদ্র কোলাহলের মতো অবিরাম ক্ষণে। যাকে নগরের যত বিষাদ ভর করে, যে বিনিদ্র জেগে আছে এক রুপালি রাতে! স্বপ্ন অ্যালবামের আরেক গানে বলছেন, ‘এক জীবনে আর কতবার আমি কেঁদে যাব? এক জীবনে আর কতবার আমি ব্যথা পাব? এই জীবন শেষে আমার মরণ এসে দাঁড়াবে পাশে। তখনো বুঝি কেঁদে কেঁদে যাব।’ তবে বাচ্চুর ‘নীল বেদনা’ গানটি ছাড়িয়ে গেছে সব কষ্টের গানকে: ‘বুকভরা শুধু দুঃখেরই ক্ষত, বাউলের একতারার মতো, এই আমাকে শুধু কাঁদায়, নীল বেদনা ঘিরে রয়েছে আমায়, দূর অতীতের দুঃখ ডাকে আমায়।’
বাচ্চু বোধ করি বুঝতে পেরেছিলেন, আজকের আনন্দ কালকের হাহাকারে পরিণত হবে। তাই বলেছিলেন, ‘জীবনের সেই প্রান্তে দাঁড়িয়ে কান্না পেলে আর লুকাব না। হারিয়ে যাবার সেই হাহাকারে, নতুন করে আর কিছু চাইব না।’
নব্বইয়ের দশক ছিল মূলত কনসার্ট ও ব্যান্ড কালচারের জন্য স্বর্ণযুগ। প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও কনসার্ট লেগেই থাকত। বাবার পকেট কেটে কনসার্টের লোভে রাজধানীতে আসা সেই দুরন্ত কৈশোর,সেই দুরন্ত প্রেম এলআরবি, প্রিয়জন হয়ে যাওয়া বাচ্চু।
‘আমার সন্তানেরা ছোটবেলা থেকে আমার মুখে একটা গল্প শুনে অভ্যস্ত। এই ঢাকা শহরে ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে মাত্র ৩০০ টাকা নিয়ে এসেছিলাম। উঠেছিলাম এলিফ্যান্ট রোডের একটি হোটেলে।
ঢাকা শহরে আমি যখন ৬০০ টাকা নিয়ে আসি, তখন এখানে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন থাকতেন। আমি কারও কাছেই যাইনি। বিপদে কারও মুখাপেক্ষীও হইনি। নিজেকে গড়ে তুলেছি। কাজে হাত দিয়েছি। কাজের পর কাজ করেছি। এখনো করেই যাচ্ছি। দিনরাত্রি কাজ করে একটা অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।’
নিজের নিজেকে এভাবেই তুলে ধরেছিলেন আমাদের এবি।
আমার শৈশব কৈশোর আর তারুণ্যের বেশির ভাগ সময় কেটেছে  যে ভালবাসার শহরে, সে শহরে কান পাতলে আজও শুনি বাচ্চুর কথাগুলো
‘হাসতে দেখ,গাইতে দেখো
অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো
দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা।’
জন্ম শহর ছেড়ে যখন প্রথম পা বাড়ালাম পাহাড়ে আমার ভালবাসার শহরে,বাচ্চুর শহরে।  মন খারাপের অশ্রুমাখা দহনদগ্ধকালে বহুদিন আমি বাচ্চুর রূপালি গিটারের অকল্পনীয় দক্ষতায় বুঁদ থেকেছি।
”এখন অনেক রাত/ খোলা আকাশের নিচে/জীবনের অনেক আয়োজন আমায় ডেকেছে/তাই আমি বসে আছি দরজার ওপাশে…।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে চলতে চলতে হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠা
 ‘আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে আর বেশী কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে,
এই বুকে যন্ত্রণা বেশী সইতে পারি না
আর বেশী কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে।।’
আইয়ুব বাচ্চু এভাবেই জড়িয়ে ছিলেন।
ইট,কাঠ,পাথরের এই রুক্ষ্ম প্রাণহীন সময়ে আমার,আমাদের জীবনের কতো শতো মুহূর্ত ঘন্টা দিন এবং রাত্রি রাঙিয়ে দিয়েছেন আপনি!
Love Runs Blind (L.R.B) শুরু হয়েছিলো ১৯৯১ সালে এই কিংবন্তীর হাত ধরেই। তারপর একে একে সৃষ্টি হয়েছে ‘রূপালি গিটার’, ‘রাত জাগা পাখি হয়ে’, ‘মাধবী’, ‘ফেরারি মন’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘বার মাস’, ‘হাসতে দেখ’, ‘উড়াল দেব আকাশে’। ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি,’ ‘সেই তুমি কেন অচেনা হলে’, ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘মেয়ে ও মেয়ে’, ‘কবিতা সুখ ওড়াও’, ‘এক আকাশ তারা’ গানগুলো ছাড়া জীবনকে ভাবা যায় না।আরো কতো মনোমুগ্ধকর লিরিক, সুর।
এতো খ্যাতি, এতো আয়োজন, এতো ভালোবাসা সব ছেড়েই চলে গেলেন।
তরুণ যে ছেলেটা আজ কাঁধে গিটার নিয়ে ঘুরছে, তার তাড়নাটা এসেছে আইয়ুব বাচ্চুর কাছ থেকে। বাংলাদেশের যে বাচ্চা ছেলেটা আজও মা–বাবার কাছে গিটার কিনে দেওয়ার আবদার করে, সেটাও ওই আইয়ুব বাচ্চুর কারণে। আইয়ুব বাচ্চুর মতো গিটারিস্ট হতে চায় তারা। আইয়ুব বাচ্চু নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন আবার তিনিই দেখিয়েছেন তরুণদের।
গিটার কথা বলে ওঠে বাচ্চুর আঙুলের স্পর্শে,সেই জাদুকরে রয়ে যাবেন বুকের নগরে।
তোমার রুপালি গিটারের তারে কেটেছে কত দুপুর! তোমার সুরে হেসেছি, কেঁদেছি, ভালোবেসেছি, বড় হয়েছি। যত দূরেই যাও এই রুপালি গিটার ফেলে, আমাদের ঘুম ভাঙ্গা শহরে তুমি চির চেনাই রবে।
তুমি ভালোবেসো, আমার ভালোবাসা! যখন কখনো আমি থাকব না, দুঃখ না–হয় তুমি পেলে সীমাহীন, তবুও তুমি ভালোবেসো আমায়।’ আপনার জন্য আমাদের ভালোবাসা অসীম, বাচ্চু ভাই। দুঃখে চোখ জ্বালা করছে সীমাহীন। তবু এই দুঃখের সীমাহীন স্রোতের মাঝে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ভালোবাসা বাড়ছে। আপনি আমার কেউ না, কিন্তু আপনি আমার জীবনের বড় একটা অংশজুড়ে ছিলেন। আপনার চলে যাওয়ায় তাই আমি পরিণত হয়েছি এক বেদনায় আচ্ছন্ন মানুষের মতো। নীল বেদনা ধীরে ধীরে আমাকেও গ্রাস করছে।
কালো পোষাকের রেকলেস গ্যাংস্টার, কিংবা দরদী কন্ঠের ফেরারী প্রেমিক!
দেখো না কেউ হাসি শেষে নীরবতা…
চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে…
আইয়ুব বাচ্চু এক জন্মহীন নক্ষত্রের মতো জেগে আছেন থাকবেন।
শুভ জন্মদিন আইয়ুব বাচ্চু

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 abcbdtv
Design & Develop BY ABC BD TV
themesba-lates1749691102