বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০২:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

দেশ বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

সংগ্রহেঃ মোস্তাফিজুর রহমান লাকি। বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১
  • ৬৭ Time View
মেধা-মনন জুড়ে কবির রবিঠাকুর আছেন,
উপরন্তু বস্তুবোধের শিল্পসহ বাঁচেন।
প্রগতিকে মান্য করে ঋদ্ধ পথিক যিনি,
তাঁর প্রকৃতির বিশিষ্টতা হয়তো কিছু চিনি।
কবি শঙ্খ ঘোষের কাব্য দর্শন কবিতায় এসেছে এভাবে শামসুর রাহমান।
হুমায়ুন আজাদ বলেছেন : ‘১৯৬০ বাঙালি মুসলমানের আধুনিক হয়ে ওঠার বছর; তাঁদের কবিতার আধুনিকতা আয়ত্তের বছর।’ কেন? কারণ, শামসুর রাহমানের প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে বের হয় ১৯৬০ সালে। ‘বইটির নামই বিকিরণ ক’রে নতুন চেতনা, এবং কল্পনাকে সরল রোমান্টিকতা-আশাউচ্ছ্বাস থেকে বিরত করে এক জটিল গভীর নিঃসীম আলোড়নের মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেয়।’
আরেক প্রধান কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যথার্থ বলেছেন – “তাঁর সব রচনা বিশ্ব সাহিত্যের অন্তর্গত , তাঁর পা সব সময় গাঁথা থেকেছে স্বদেশের মাটিতে ।” সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা যেমন উদ্দীপক হয়ে কাজ করে তেমনি প্রেমের কবিতাতেও তিনি অনন্যসাধারণ। তার রূপকল্প-চিত্রকল্প নির্মাণের অসাধারণত্ব বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শামসুর রাহমান ত্রিশের দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমাদের কাব্য-ভাষা বিবর্তনের সাঁকো হিসেবে কাজ করে গেছেন। ’
১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর তিলোত্তমা শহর ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মে ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের ৭৭ বছরের বর্ণময় জীবনের বড় অংশজুড়েই নিমগ্ন থেকেছেন কবিতা সৃজনের মোহ ও অনুরাগে। পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠায় নগর জীবনের নানা অনুষঙ্গ ও প্রকরণ উদ্ভাসিত হয়েছে এ নাগরিক কবিতার কবিতায়। জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার পথে ধাবিত করায় তাঁর ভূমিকাটি একেবারেই স্বতন্ত্র। বিশ শতকের তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রসিদ্ধ।
সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যেমন কবিতার ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত মানুষকে প্রেরণা দিয়েছেন কবিতার সৃষ্টিশীলতায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ একইসঙ্গে পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ও সমাদৃত।
শামসুর রাহমান। আধুনিক বাংলা কবিতা যার হাত ধরে পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়েছে; পেয়েছে অত্যাশ্চর্য দ্যুতি। ছয় দশকজুড়ে কবিতার প্রতি অকুণ্ঠ দায়বদ্ধ থেকে কবি বাংলা ভাষায় যা উপহার দিয়েছেন; তা আধুনিকতা ও মানবিকতার অমূল্য দলিল।
শামসুর রাহমান বাংলা কাব্যে সর্বসময় নাগরিকতার ধারক। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, ব্যর্থতা, শোভাহীনতা, নৈঃসঙ্গ্য শামসুর রাহমান সেলাই করে দিয়েছেন তাঁর কবিতায় ।
এই নারকীয় নগর প্রতিবেশেও আকাশে ওঠে দুর্মর চাঁদ; ‘বাউন্ডুলে ময়লা ভিখারী আর লম্পট জোচ্চোর গ-মূর্খ আর ভন্ড ফকির অথবা অর্ধমগ্ন ভস্মমাখা উন্মাদিনী বেহেড-মাতাল’ অধ্যুষিত এ-শহরে কখনো ‘রজনীগন্ধার ডালে কাগজের মতো চাঁদ বুনে স্বপ্নের রূপালি পাড়’ নগরসভ্যতার ভালো-মন্দের সংমিশ্রণে শামসুর রাহমানের মনোবিশ্ব।
অতৃপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো মহাকালের গর্ভ থেকে ধূলিধূসরিত একটি বিস্মৃতপ্রায় জাতিসত্তার বোধকে লেখনী দিয়ে বার বার জাগিয়েছেন যে মানুষটি তিনি শামসুর রাহমান – এক নিঃসঙ্গ শেরপা।
আমাদের যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ, যা কিছু শ্রেষ্ঠ— সেসব কিছুর এক অসমান্য সমন্বয় ঘটেছিল বাংলা কবিতার যুবরাজ শামসুর রাহমানের মধ্যে।
ধর্মান্ধদের প্রলয়সংগীতে উন্মত্ত পাকিস্তানি জমানায় তিনি আধুনিকতার পতাকা দৃঢ় হাতে উত্তোলিত রেখেছেন। তবে চারদিক থেকে ধেয়ে আসা কালো হাওয়াকে মোকাবেলা করেই গেয়েছেন মুক্তির , জীবনের গান ।
বায়ান্নোর রক্ত ও অশ্রুরঞ্জিত বাংলা ভাষাকে বর্ম করে তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন । বাংলা ভাষার অস্ত্র উঁচিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন দুঃসময়ের মুখোমুখি।
 আবেগহীন , মমতাহীন বেজান নগরে রেখে গেছেন কবিতার এক সুদূরপ্লাবি নগর, যার অনন্ত নাগরিক শামসুর রাহমান । প্রয়াণ শব্দটি কখনও এই মানুষটিকে ছুঁয়ে যাবে না
নেকড়ের উদ্যত থাবা থেকে তিনি আফ্রোদিতি- উদ্ধারে ব্রতী। একশীর্ষ-বহুশীর্ষ নাগের মুখে তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন তার কবিতার অব্যর্থ মন্ত্র;
“আমার কবিতা করে বসবাস বস্তি ও শ্মশানে
চাঁড়ালের পাতে খায় সূর্যাস্তের রঙলাগা ভাত,
কখনো পাপিষ্ঠ কোন মুমূর্ষু রোগীকে কাঁধে বয়ে
দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যায় আরোগ্যশালায়।
(নিজের কবিতা বিষয়ে কবিতা)
শামসুর রাহমান : সংগ্রামী চেতনার নিবিড় ভাষ্যকার , আমাদের স্বাধীনতাকে, মূল্যবোধকে অক্ষরে অনুপ্রানিত ও বেধে রাখা প্রধান মানুষ তোমার প্রয়াণকে অস্বীকার করব আমৃত্য।
কবি শামসুর রাহমান আমাদের গর্ব; যার বুক আর বাংলাদেশের হৃদয়ে কোনো তফাৎ নেই, থাকতে পারে না!
আজ কবির চলে যাওয়ার দিন।প্রয়াণ শব্দটা বড্ড বেমানান  বাংলা কবিতার যুবরাজ তোমার জন্য।
শ্রেষ্ঠ কবিতা’র প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন,
“আমিতো জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে চাই, কুড়িয়ে আনতে চাই পাতালের কালি, তার সকল রহস্যময়তা। যে মানুষ টানেলের বাসিন্দা, যে মানুষ দুঃখিত, একাকী— সে যেমন আমার সহচর, তেমনি আমি হাঁটি সে সব মানুষের ভিড়ে, যারা ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে তৈরি করে মিছিল।”
লেখকঃ জনপ্রিয় ফেসবুকার লুৎফুল কবির রনি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 abcbdtv
Design & Develop BY ABC BD TV
themesba-lates1749691102