বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০১:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

আগস্ট, ১৯৭৫। মুজিবকে উৎখাত করা

ABC BD TV
  • Update Time : রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১
  • ১৬৪ Time View
আগস্ট, ১৯৭৫। মুজিবকে উৎখাত করা হবে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এমন একটা গুজব ভেসে বেড়াতে লাগলো। এক কান দু’ কান হয়ে গুজবটি ক্যান্টনমেন্টের প্রায় সবার কানেই গেল। সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান সহ সিনিয়র অফিসারেরাও গুজব সম্পর্কে  জানতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে শফিউল্লাহ শেখ মুজিবকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সেনাবাহিনী ঠিক আছে। তার কয়েকদিন পরেই ঘটে ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ড।
১৫ আগস্ট ভোর তিনটায় আত্মস্বীকৃত খুনি লেঃ কর্নেল ফারুক সমবেত সৈন্যদের উদ্দেশে একটি জ্বালাময়ী ভাষণ শুরু করেন। ভাষণে ফারুক বঙ্গবন্ধু সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। উপস্থিত সৈন্যদেরকে ঐ রাতেই বন্ধবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সম্মত করান। ঠিক ঐ সময়ে মেজর (অব:) শরিফুল হক ডালিম সামরিক পোশাকে সজ্জিত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হন। মেজর ডালিম তাদের দলে আছেন বলে নিশ্চিত করেন। কিন্তু তখনও সৈন্যদের বলা হয়নি যে, বঙ্গবন্ধু বা তার পরিবারবর্গের সদস্যদের হত্যা করা হবে। মেজর ডালিমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। বেগম মুজিবকে তিনি মা ডাকতেন। ডালিমের স্ত্রী নিম্মি ছিলেন শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যার খবরটিও ১৫ আগস্ট ভোরে মেজর ডালিমই বাংলাদেশ বেতারে প্রচার করেন।
সেই ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সেনাবাহিনীর কিছু উশৃঙ্খল অফিসার গোলাবারুদ নিয়ে আক্রমণ করে। শেখ কামাল নিচে নেমে যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, “আর্মি আর পুলিশ ভাইয়েরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন; ঠিক তখন শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডিভিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম খান। তাঁরা দেখতে পান মেজর নূর, মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকেন। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা ‘হ্যান্ডস আপ’ বলে চিৎকার করতে থাকে। ঘটাস্থলেই শেখ কামালকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
শেখ কামালকে হত্যার পর ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই ঘাতকরা তাকে ঘিরে ফেলে।
বঙ্গবন্ধু বলেন, “তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি- বেয়াদবি করছিস কেন?”
এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝিতে অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ান।
সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে গুলি করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহ পড়ে থাকে সিঁড়ির মধ্যে। সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে।
কিছুক্ষন পর মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যদলসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকেন। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যান। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করেন। ঘাতকরা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী। চিৎকার করে বলেন, “আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।” ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ সবাইকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ।
অনেক চেষ্টা করেও যে মুজিবকে মারতে পারেনি তার দেশবিদেশের চিহ্নিত শত্রুরা, সেই মুজিবকে হত্যা করল তারই অতি নিকটজনেরা, যা ছিল মুজিবের কল্পনারও বাইরে।
১৫ আগস্ট ভোরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীরর কমান্ডার শাফায়েত জামিল জিয়াউর রহমানকে মুজিব হত্যাকান্ডের ঘটনাটি জানান, উত্তরে জিয়া বলেছিলেন, “president is dead, so what? Vice president is there. You should uphold the constitution, get your troops ready”.
শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার প্রক্রিয়া আইন করে বন্ধ করার আয়োজন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে শাস্তি এড়াবার জন্য বাংলাদেশে “ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ” আইন প্রণয়ন করা হয়। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ একটি অধ্যাদেশ ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ প্রণয়ন করেন। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল। পরে ১৯৭৯ সালে সংসদ কর্তৃক এটি অনুমোদন করা হয়। যার ফলে এটি একটি আনুষ্ঠানিক আইন হিসেবে অনুমোদন পায়। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, শুধু তাই নয় খুনি চক্রকে রক্ষা করতে দুই সরকারই তাদের দিয়েছেন বিদেশে চাকুরী সহ নানান সুযোগ সুবিধা।
১৯৯০ সালে তিনজোটের আন্দোলনে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। বাংলাদেশে শুরু হয় নতুন শাসন ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্র। খালেদা জিয়া জনগণের মেন্ডেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নতুন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হলেন লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান।
মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলেন। সেইসময়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গঠিত ট্রাইবুনালের বিচারক ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। পাকিস্তানিদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সময়টা তখন ১৯৯২ সালের অগাস্ট মাস। খালেদা জিয়া তখনও ১৫ অগাস্ট কেক কেটে জন্মদিন পালন শুরু করেন নি। মোস্তাফিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে একটি সুপারিশ পেশ করেন। ১৯৭৫ এর আত্মস্বীকৃত তিন খুনির পদোন্নতি দিতে হবে। এদের একজন মেজর ডালিম, অন্যজন নূর, তৃতীয় জন মেজর আজিজ পাশা। সুপারিশ পেয়ে বেগম জিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন পদোন্নতি সংক্রান্ত ফাইল তৈরি করতে। শোনা যায় দু’একজন মন্ত্রী বেগম জিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনজোটের আন্দোলনের ফসল এই সরকার। তাছাড়া জোটের সবচেয়ে বড় দল আওয়ামী লীগ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। এই অবস্থায়ই সব খুনির পদোন্নতি দেওয়া হলে, বিএনপির ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা আছেন, বঙ্গবন্ধুকে যারা ভালোবাসেন তাদের আস্থা হারাবে। বিএনপি র মতো একটি দল কেন তিন আত্মস্বীকৃত খুনির দায়দায়িত্ব নেবে। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা পদন্নতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করলেন। বেগম জিয়া শুধু শুনলেন, এবং চুপ থাকলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান দ্রুত ফাইল তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেন। বেগম জিয়া ফাইলে স্বাক্ষর করলেন।
১৫ অগাস্ট শোক দিবসের ঠিক এক দিন আগে; ১৩ আগস্ট’ ৯২; বঙ্গবন্ধুর তিন আত্মস্বীকৃত খুনির পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
পরেরদিন ১৪ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় খালেদা জিয়ার বাসায় কিছু আমন্ত্রিত অতিথি আসেন। কারা আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন এই বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা দূরহ। তবে জানা যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, কর্নেল (অব.) ফারুক, মেজর (অব.) ডালিম এবং পাকিস্তান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত সেই রাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা একসাথে খোশগল্পে মেতে ওঠেন ও ডিনার সারেন। জানা যায়, রাত বারোটার অল্পসময় আগে  বাইরে থেকে একটা ঢাউস সাইজের কেক আসে। উপস্থিত সবাই সমস্বরে বলে ওঠেন, :লেট’ স সেলিব্রেট ফিফটিনথ অব অগাস্ট।”১৫ আগস্ট সকালে পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বেগম জিয়ার জন্য আসে জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা।
১৫ আগস্টের অভ্যূত্থ্যানের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনদের হত্যা করা। এছাড়াও আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল, যার কারণে সংঘটিত হয় ৩ নভেম্বর জেল হত্যা। যে কারণে পর্বরীতে তারা খুব সহজেই রক্তাক্ত করে বাংলাদেশের সংবিধান। বহু প্রতীক্ষিত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দেরিতে সম্পন্ন হলেও পুনরুদ্ধার করা যায়নি আজও বাংলাদেশের সংবিধান।
লেখকঃ অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ফেসবুকার রাজসিক হোসাইন।
 abc television 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 abcbdtv
Design & Develop BY ABC BD TV
themesba-lates1749691102